ইন্টারনেটের রহস্যময় জগৎ ডার্ক ওয়েবে তৎপর জঙ্গিরা!

ডেস্ক: ক্রমাগত অভিযান এবং কঠিন গোয়েন্দা তৎপরতার কারনে দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তাদের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, সদস্য সংগ্রহ ও তৎপরতা কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি। ডার্ক ওয়েবে দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। এছাড়াও বিভিন্ন অ্যাপস ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ‘প্রটেক্টিভ টেক্সট’ চালাচালি করে জঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে, যা পুলিশ ও র‌্যাবের নজরদারিতে ধরা পড়েছে।

তবে জঙ্গিদের এমন তৎপরতা পুরোপুরিভাবে নজরদারি ও বন্ধ করার পদ্ধতি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নেই। পুলিশ ও প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, কিছু লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হলে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গিদের এই তৎপরতাও বন্ধ করতে পারে।

জেএমবি, নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম এখন দেশে তৎপর রয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব ও পুলিশ। তারা ডার্ক ওয়েবে এখন বেশি তৎপর। এখানেই তারা সব নির্দেশনা পেয়ে থাকে এবং নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে। তবে নতুন সদস্যদের ডার্ক ওয়েবে স্বাগত জানায় না জঙ্গি সংগঠনগুলো। যখন একজন জঙ্গি জঙ্গিবাদের দিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকে যায়, সংগঠনের সব নির্দেশনা সে মেনে নেয়, কথামতো চলে, কেবল তখনই কয়েকটি ধাপ পার হয়ে এই ডার্ক ওয়েব ও প্রটেক্টিভ টেক্সট অ্যাপসের যোগাযোগ চ্যানেলে আসতে পারে একজন জঙ্গি।

ডার্ক ওয়েব কী?
ইন্টারনেট দুনিয়াকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়। একটি সারফেস ওয়েব (Surface Web) বা সবার জন্য উন্মুক্ত ওয়েব, অপরটি (Deep Web) বা ডার্ক ওয়েব (Dark Web)। সাধারণ মানুষ সবাই যেটা ব্যবহার করে তা হলো সারফেস ওয়েব। এই অংশটির তথ্য সবার জন্য উন্মুক্ত। যে কেউ এখান থেকে তথ্য খুঁজে নিতে পারবে। এই সারফেস অংশের নিচের বা আড়ালের অংশটি হচ্ছে ডিপ ওয়েব। যেখানকার তথ্য সহজে সাধারণ মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব নয়। ইন্টারনেটের এই জগতে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অপরাধীদের বিচরণ থাকে। মাদক, চোরাচালান, নীলছবির বাণিজ্য হয়ে থাকে এই ডার্ক ওয়েবে। জঙ্গিরা এখন ডার্ক ওয়েবে সক্রিয়ভাবে কাজ করে থাকে। এই ডার্ক ওয়েবে বিশেষ ব্রাউজারের মাধ্যমে প্রবেশ করতে হয় বলে জানান তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা। তিনি বিভিন্ন সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে জঙ্গিদের প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ে কাজ করেছেন।

তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘একসময় দেশের জঙ্গিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খুব অ্যাক্টিভ ছিল। কিন্তু বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে ডার্ক ওয়েব জগতে চলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের তৎপরতা থাকলেও তাদের মূল যোগাযোগ মাধ্যম প্রটেক্টিভ টেক্সট অ্যাপসগুলো এবং ডার্ক ওয়েব।’

ডার্ক ওয়েবকে কেন নিরাপদ ভাবছে জঙ্গিরা?
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যানুযায়ী, একসময় জঙ্গিরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইউটিউবে তাদের ভাষায় কথিত জিহাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতো। একইসময় ফেসবুক, টুইটার ও ইউটিউবে তারা দাওয়াতি প্রচারও করতো। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতায় তা কিছুটা হলেও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাই তারা ডার্ক ওয়েবে স্থানান্তরিত হয়েছে। এখানে মনিটরিং ব্যবস্থা যেমন জটিল, তেমনি জঙ্গিদের পরিচয়ও গোপন থাকে। তাদের খুঁজে পাওয়াও সহজ নয়।

তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘ডার্ক ওয়েবের সদস্য হতে হলে ওই ব্যক্তিকে তার ডিভাইস ও নিজের আইডেন্টি বা পরিচয় গোপন করে ঢুকতে হয়। TOR ব্রাউজারসহ আরও কিছু ব্রাউজার আছে, যেগুলো ডিভাইসে ইনস্টল দিয়ে নিলে ব্যবহারকারীর পরিচয় হাইড (গোপন) হয়ে যায়। ব্যবহারকারীর কোনও পরিচয় থাকে না। এরপর নির্দিষ্ট ওয়েব ঠিকানায় তাকে প্রবেশ করতে হবে। এই ওয়েব অ্যাড্রেস জঙ্গিরা তাদের সদস্যদের দিয়ে থাকে। ডার্ক ওয়েবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সাইট রয়েছে। সেখানে তাদের জন্য সব নির্দেশনা থাকে। জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে এভাবে যোগাযোগ করে।’

এই সাইটগুলো ভিজিট করার পর আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর নির্দেশনা একের পর এক আসতে থাকে।

পুলিশ দাবি করেছে, জঙ্গি সংগঠনের অনেক সদস্য অল্প বা অর্ধশিক্ষিত হলেও তারা তথ্য প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পারদর্শী হয়। তাদের প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যাতে তারা স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাব, রেকর্ডার, ক্যামেরা পরিচালনা করতে পারে। এজন্য তারা এসব ব্যবহার করতে পারছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

বাংলাদেশের যেসব জঙ্গি সংগঠন ডার্ক ওয়েবে তৎপর
বাংলাদেশে নব্য জেএমবি ও আনসার আল ইসলাম আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য ডার্ক ওয়েবে তৎপর রয়েছে। আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের নির্দেশনা ও কার্যক্রম অনুসরণ করতে ফোরামভিত্তিক আলোচনার জন্য ডার্ক ওয়েব ব্যবহার করে থাকে তারা। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপ-কমিশনার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘দেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা ফোরামভিত্তিক আলোচনার জন্য ডার্ক ওয়েবে তৎপর।’

প্রটেক্টিভ টেক্সট যোগাযোগের অন্যতম আরেকটি মাধ্যম
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, ইমো ছাড়াও টেলিগ্রাম, থ্রিমা অ্যাপস, উইকার অ্যাপস ব্যবহার করে জঙ্গিরা। প্রটেক্টেড টেক্সট নামে একটি সাইটের মাধ্যমেও তারা যোগাযোগ করে থাকে। তবে টেলিগ্রাম তাদের কাছে জনপ্রিয় বেশি। এসব অ্যাপস ব্যবহার করা সহজ। এছাড়াও জঙ্গি সংগঠনগুলো নিজেরাও কিছু অ্যাপস তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে তারা যোগাযোগ রক্ষা করছে। এসব অ্যাপসের সদস্য নির্দিষ্ট। গুলশানের হলি আর্টিজান হামলার পর জঙ্গিরা উইকার অ্যাপস ও প্রটেক্টেড টেক্সট সাইট ব্যবহার করে ওই ঘটনার ছবি পাঠানোসহ যোগাযোগ করেছে। কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘এসব অ্যাপস নিরাপদ মনে করে জঙ্গিরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিতে তারা এভাবে যোগাযোগ করে থাকে।’

হলি আর্টিজান মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট সিটিটিসি’র এক কর্মকর্তা বলেন, ‘জঙ্গিরা ধরা পড়লে কীভাবে তাদের ডিভাইস থেকে সব তথ্য একেবারে মুছে ফেলতে পারে সেই সফটওয়্যারও তাদের কাছে থাকে। এসব ব্যবহার করলে আর কখনও তথ্য উদঘাটন করতে পারবে না কেউ।’

হলি আর্টিজান মামলায় গ্রেফতার হাসনাত করীমের মোবাইল থেকে উইকার অ্যাপস ব্যবহার করে জঙ্গিরা বাইরে ছবি পাঠিয়েছিল। এছাড়াও তারা বাইরে জঙ্গিদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য এই অ্যাপস ব্যবহার করেছিল বলে পুলিশ পরবর্তীতে তদন্তে জানতে পেরেছে। জঙ্গিরা তার স্মার্টফোনটি এজন্য ব্যবহার করেছিল।

তবে এসব অ্যাপস ব্যবহারের ক্ষেত্রে জঙ্গিরা কৌশলী হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন প্রযুক্তিবিদ তানভীর জোহা। তিনি বলেন, ‘জঙ্গিদের যেসব মোবাইল এর আগে উদ্ধার করা হয়েছে সেগুলোর বেশিরভাগ ফরেনসিক করা যায়নি। কারণ, তারা এমন সফটওয়্যার ব্যবহার করছে, ধরা পড়ার পর যা থেকে কোনও তথ্য উদ্ধার করা যায়নি। ‘নাইটমেয়ার’ নামে একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করলে এটা হয়।’

তবে জঙ্গিদের এসব কার্যক্রম দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মনিটরিংয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের উপকমিশনার মহিবুল ইসলাম খান। তিনি বলেন, ‘আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি। তবে ডার্ক ওয়েব দুনিয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অপরাধীদের অবস্থান রয়েছে। তারা এটা ব্যবহার করে। জঙ্গিরা নিজেদের মধ্যে ফোরামভিত্তিক যোগাযোগ করে ডার্ক ওয়েবে। আমাদের মনিটরিংয়ে আছে সবকিছু।’



তবে জঙ্গিদের এ ধরনের যোগাযোগ একেবারে বন্ধ করা না গেলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, ‘সদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই এসব বন্ধ করা যায়। তবে এজন্য বিটিআরসিকে উদ্যোগ নিতে হবে।’




নাম

অর্থ ও বাণিজ্য,201,আন্তর্জাতিক,692,কাপাসিয়া,302,কালিয়াকৈর,361,কালীগঞ্জ,223,খেলা,574,গাজীপুর,3492,চাকরির খবর,25,জয়দেবপুর,1572,জাতীয়,2569,টঙ্গী,851,তথ্যপ্রযুক্তি,489,ধর্ম,189,পরিবেশ,130,প্রতিবেদন,295,বিজ্ঞান,54,বিনোদন,592,ভিডিও,58,ভিন্ন খবর,140,ভ্রমন,108,মুক্তমত,26,রাজধানী,784,রাজনীতি,1005,লাইফস্টাইল,265,শিক্ষাঙ্গন,367,শীর্ষ খবর,9271,শ্রীপুর,421,সাক্ষাৎকার,12,সারাদেশ,606,স্বাস্থ্য,196,
ltr
item
GazipurOnline.com: ইন্টারনেটের রহস্যময় জগৎ ডার্ক ওয়েবে তৎপর জঙ্গিরা!
ইন্টারনেটের রহস্যময় জগৎ ডার্ক ওয়েবে তৎপর জঙ্গিরা!
https://3.bp.blogspot.com/-Hnr_YVq4IvM/W0XYS8da2zI/AAAAAAAAZBY/E3oGqVk6iBc_JifblLbGILWYwYUXpYMxACLcBGAs/s400/Dark-deep-web.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-Hnr_YVq4IvM/W0XYS8da2zI/AAAAAAAAZBY/E3oGqVk6iBc_JifblLbGILWYwYUXpYMxACLcBGAs/s72-c/Dark-deep-web.jpg
GazipurOnline.com
https://www.gazipuronline.com/2018/07/darkweb.html
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/2018/07/darkweb.html
true
13958681640745950
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Read More Reply Cancel reply Delete By প্রচ্ছদ PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share. STEP 2: Click the link you shared to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy