যে স্টিমারে চড়তে বিদেশীরা ছুটে আসেন বাংলাদেশে

বুড়িগঙ্গা সেতুর ওপর থেকে নিচের দিকে তাকানো মাত্রই নজর কাড়লো চোখে কমলা রঙের চারটি নৌযান। একদম স্থির হয়ে আছে। একটির গায়ে লেখা 'এমভি বাঙালি', আরেকটিতে 'এমভি মধুমতি'। অন্য দুটিতে কোনো কিছু লেখা নেই। মোটা রশি দিয়ে একটির সঙ্গে আরেকটিকে বেঁধে রাখা হয়েছে শক্তপোক্তভাবে। স্থানীয় লোকজনের কেউ কেউ এগুলোকে 'রকেট' বলেন, কেউবা বলেন 'স্টিমার'।

নৌযানগুলোর দুটির চেহারায় অল্পস্বল্প পরিচ্ছন্নতার ছাপ থাকলেও অন্য দুটি একেবারেই জরাজীর্ণ। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) এসব স্টিমার এক সময় জনপ্রিয় ছিল সবার কাছে। বাবুবাজার লাগোয়া বাদামতলীর ফলের আড়তদার ওয়াসিম উদ্দিন জানান, অনেক দিন ধরেই তিনি এসব সরকারি স্টিমারকে দেখছেন এখানে। তার ভাষায়, এগুলোকে 'চলতে তো দেহি না।'

অথচ একসময় এই বাহনটিই ঢাকা-বরিশাল, বরিশাল-গোয়ালন্দ যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল। তখনকার মানুষ এ স্টিমারে করে গোয়ালন্দ গিয়ে ট্রেনে কলকাতা যেত। কিন্তু এখন খুব বেশি মানুষ এই স্টিমারে চড়েন না। তবে অনেক পর্যটকের ভ্রমণ তালিকায় প্যাডেল স্টিমারের নাম থাকে। অনেক বিদেশী শুধু এটাতে চড়তেই বাংলাদেশে আসেন।

প্রায় শত বছর আগে থেকে ইংল্যান্ডের রিভার অ্যান্ড স্টিম নেভিগেশন (আরএসএন) কোম্পানির বিশাল বিশাল সব স্টিমার চলাচল করত এ ঘাট দিয়ে। নামগুলো বেশ বাহারি ছিল। ফ্লেমিংগো, ফ্লোরিকান, বেলুচিসহ আরো কত কি নাম! বলা হয়ে থাকে ব্রিটিশ সরকার নাকি বরিশালে রেলপথ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছিল। কিন্তু ব্যবসা হারানো ভয়ে স্টিমারের মালিকরা ব্রিটেন বসে কলকাঠি নেড়েছিলেন বলে বরিশাল রেলপথ যায়নি।

সম্প্রতি যে স্টিমারগুলো এখনো চলাচল করে তারমধ্যে এমবি বাঙালী সবচেয়ে বড় এবং আধুনিক। রকেট স্টিমার সামনের দিকে এগুনোর জন্য দুই পাশে বড় বড় দুটি প্যাডেল থাকে। যার জন্য এর নাম প্যাডেল স্টিমারও বলা যায়। শুনলাম শুরুর দিকে নাকি স্টিমারগুলো কয়লা দ্বারা উৎপন্ন স্টিমে চলতো বলে এর নাম স্টিমার। কিন্তু এখন আর স্টিমে চলে না। এখন চলে ডিজেলে তবুও এর নাম রয়ে গেছে স্টিমার। আবার রকেট ডাকা হতো হয়তো তখনকার সময়ের সবচেয়ে দ্রুত গতির নৌযান ছিল বলে। তাছাড়া নৌপথে চলাচলের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ হল স্টিমার। বাংলাদেশের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত স্টিমার ডুবার খবর শোনা যায়নি। কারণ স্টিমার গতিতে লঞ্চ থেকে ধীর হলেও সবচেয়ে নিরাপদ নৌ-পরিবহন।

ভ্রমণ পরিকল্পনা
বন্ধ হয়ে যাবার আগেই ভ্রমণ করতে পারেন স্টিমারে। আপনার ভ্রমণটা শুরু হতে পারে কোনো এক সন্ধ্যায়। ঠিক সাড়ে ৬টায় এ স্টিমারে উঠে বসতে পারেন। ভু-উ-উ শব্দ করে সামনে দিকে এগুতে থাকবে প্রাচীন যানটি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ শহরকে পাশ কাটিয়ে বুড়িগঙ্গা পাড়ি দিয়ে রকেট যখন মেঘনায় পড়বে, তখন রাত ৮-৯টা বেজে যাবে। যদি চাঁদনী রাত হয়, তো সোনায় সোহাগা। চারদিক ধবল জোসনায় আলোকিত হবে, মেঘনার গভীর জলে চাঁদের আলোর খেলা জমে উঠবে। এ আলোর খেলা দেখতে দেখতেই রাত সাড়ে ১১টার সময় স্টিমার চাঁদপুর ঘাটে ভিড়বে। এ সময় দোতলার সামনে চলে যেতে পারেন। কারণ চাঁদপুর থামলেই হুড়মুড় করে অনেক মানুষ উঠবে। এসব মানুষ চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চাঁদপুর এসে অপেক্ষায় থাকে এ স্টিমারে করে বরিশাল, পিরোজপুরসহ দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জায়গায় যেতে। চাঁদপুর থেকে ছেড়ে দিয়ে রকেট পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়ার মিলনস্থল অতিক্রম করবে। একটা সময় চারদিকে অথৈ জলরাশি ছাড়া কিছুই দেখবেন না।

এক ফাঁকে বাটলারকে ডেকে রাতের খাবারের অর্ডার করুন। সাধারণত দুই ধরনের মেন্যু থাকে। ভুনা খিচুড়ি, চিকেন, ডিমসহ একটি মেন্যু আর সাদা ভাত-চিকেন আর দুটি ভর্তাসহ আরেকটি মেন্যু। যেকোনো একটি মেন্যু অর্ডার করতে পারেন। দাম ২০০ টাকা। একসময় খুব সুনাম ছিল স্টিমারের বাটলারের রান্নার। তার একটু এখনো অবশিষ্ট আছে। আশা করি আপনিও এদের রান্না করা খাবার মজা করেই খাবেন।

সকালে উঠেই দেখবেন রকেট বরিশাল নোঙর করে আছে। এখান থেকে সকাল ৬টায় আবার রওনা দেয়। ঘণ্টা দেড়েক চলার পরেই আরেকটি স্টপেজ নলসিটি। এভাবেই এক ঘণ্টা পরপর একেকটি স্টপেজ আছে, খালাসিদের ব্যস্ততা বেড়ে যায়। কুলিরা দৌড়ে ওঠে কোনো পণ্য থাকলে সেগুলো নামানোর জন্য। একটু পরেই রকেট গাবখান ক্যানেলে প্রবেশ করে। ছোট্ট একটি ক্যানেল, দুই পাশে সারি সারি গাছপালা, সে অন্য রকম সৌন্দর্য। সকাল সাড়ে ১০টায় পৌঁছে যাবেন পিরোজপুরের হুলারহাট। এখানে বেশ কিছুটা সময় থাকার পর আবার রওনা দেবে দক্ষিণের পথে। এভাবে দুপুর দেড়টার দিকে পৌঁছাবে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জে।

এবার আপনার নামার পালা। মোরেলগঞ্জে নেমে বাসে করে চলে যান বাগেরহাট। এক ঘণ্টার মতো লাগবে। এরপর ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখে বাসে করে ঢাকায় ফিরে আসুন।

অন্যান্য তথ্য
ঢাকার সদরঘাট থেকে এই স্ট্রিমার ছাড়ে প্রতি শনিবার, রোববার, মঙ্গলবার এবং বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। ঢাকা থেকে বরিশালের ভাড়া: ডেক ১৭০ টাকা, ফার্স্ট ক্লাস এসি কেবিন ২৩০০ টাকা (দুই বেড ), সেকেন্ড ক্লাস নন এসি ১২৬০ টাকা (দুই বেড)। ঢাকা থেকে মোরেলগঞ্জের ভাড়া: ডেক ২৮০ টাকা, ফার্স্ট ক্লাস এসি কেবিন ৩৭১৫ টাকা (দুই বেড), সেকেন্ড ক্লাস নন এসি ২১০০ টাকা (দুই বেড)।



টিকেট অনলাইনে কাটতে হয়। সহজ ডট কম-এ গিয়ে ডানদিকে Launch-এ ক্লিক করলে একটা ঘর আসে। সেখানে তারিখ বসিয়ে কার্ড বা বিক্যাশে পেমেন্ট করলে টিকেট চলে আসে। টিকেট সাধারণত যাত্রার চার-পাঁচদিন আগে দেয়া হয়। এছাড়া ৫, দিলকুশা, মতিঝিল বা/এ এলাকায় বিআইডব্লিওটিসি'র হেড অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করেও আপনার টিকেট নিশ্চিত করতে পারেন।

COMMENTS





নাম

অর্থ ও বাণিজ্য,216,আন্তর্জাতিক,712,কাপাসিয়া,314,কালিয়াকৈর,373,কালীগঞ্জ,232,খেলা,592,গাজীপুর,3609,চাকরির খবর,29,জয়দেবপুর,1579,জাতীয়,2727,টঙ্গী,873,তথ্যপ্রযুক্তি,499,ধর্ম,192,পরিবেশ,132,প্রতিবেদন,304,বিজ্ঞান,54,বিনোদন,622,ভিডিও,58,ভিন্ন খবর,141,ভ্রমন,112,মুক্তমত,26,রাজধানী,809,রাজনীতি,1015,লাইফস্টাইল,270,শিক্ষাঙ্গন,383,শীর্ষ খবর,9773,শ্রীপুর,442,সাক্ষাৎকার,12,সারাদেশ,631,স্বাস্থ্য,206,
ltr
item
GazipurOnline.com: যে স্টিমারে চড়তে বিদেশীরা ছুটে আসেন বাংলাদেশে
যে স্টিমারে চড়তে বিদেশীরা ছুটে আসেন বাংলাদেশে
https://3.bp.blogspot.com/-cw5xpcGb5S4/XIQXeHAZCKI/AAAAAAAAbRw/0H2WHbiGKAAXf8WlMhJ-_4tNGd2tzs6RACLcBGAs/s320/s2.jpg
https://3.bp.blogspot.com/-cw5xpcGb5S4/XIQXeHAZCKI/AAAAAAAAbRw/0H2WHbiGKAAXf8WlMhJ-_4tNGd2tzs6RACLcBGAs/s72-c/s2.jpg
GazipurOnline.com
https://www.gazipuronline.com/2019/03/banglai.html
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/2019/03/banglai.html
true
13958681640745950
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Read More Reply Cancel reply Delete By প্রচ্ছদ PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share. STEP 2: Click the link you shared to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy