যেভাবে এলো মে দিবস

সাদিয়া রাজধানীর একটি স্কুলে পড়াশুনা করে। ক্লাসে নোটিশ আসলো মে দিবস উপলক্ষ্যে আগামীকাল স্কুল ছুটি। পুরো ক্লাস একসঙ্গে আনন্দে চিৎকার করে উঠলো। সে তার বান্ধবী তারিনকে জিজ্ঞেস করলো, ‘আচ্ছা, মে দিবস তো শ্রমিকদের সম্মানে সরকারি ছুটির দিন, কিন্তু এর কি কোনো ইতিহাস আছে? মানে এই দিনটার কী এমন তাৎপর্য যে আমরা ছুটি কাটাই?’ জবাবে তারিন বলল, ‘ইতিহাস জেনে কী করবি? ছুটি যখন পেয়েছি, আর কী লাগে!’

তারিনের কথা কৌতূহলী সাদিয়ার মোটেও পছন্দ হলো না। সে বাসায় এসেই মে দিবস নিয়ে ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করতে বসে গেলো! আর তারপর সে যে অসাধারণ এক গল্প আবিষ্কার করলো তা তাকে নিয়ে গেলো রোমাঞ্চ আর বিস্ময়ের তুঙ্গে!

শুরুর গল্প: ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর সময়কার কথা। শ্রমিকরা তখন দিনে গড়ে ১২ ঘণ্টা কাজ করলেও তার বিনিময়ে সামান্য মজুরিও পেতেন না। শিল্প মালিকরাই অধিক লাভ ভোগ করতো। উল্টোদিকে শ্রমিকরা মানবেতর জীবনযাপন করতো। উপরন্তু ছিল মালিকপক্ষের অনবরত অকথ্য নির্যাতন। কখনো আবার তা পৌঁছাতো ক্রীতদাসতুল্য পর্যায়ে!

১৮৬০ সালে শ্রমিকরা তাঁদের মজুরি না কমিয়ে সারা দিনে আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের জন্য দাবি জানান। এ জন্য তাঁরা একটি সংগঠনও তৈরি করেন পরবর্তীকালে, যার নাম হয় আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার। এই সংগঠন শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবিরত আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে। তাদের স্লোগান ছিল-‘Eight hours for work, eight hours for rest, eight hours for what we will.’

হে-মার্কেট ট্রাজেডি: ১৮৮৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের একদল শ্রমিক দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার জন্য আন্দোলন শুরু করেন, এবং তাদের এ দাবী কার্যকর করার জন্য তারা সময় বেঁধে দেন ১৮৮৬ সালের পহেলা মে পর্যন্ত। বারবার মালিকপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও একটুও সাড়া মেলে না তাঁদের কাছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে এক আলোড়ন তোলা আর্টিকেল। ব্যস, বিদ্রোহ ওঠে চরমে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূল মঞ্চ।

পহেলা মে যতই এগিয়ে আসছিল, দুই পক্ষের সংঘর্ষ অবধারিত হয়ে উঠছিল। মালিক-বণিক শ্রেণি ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। পুলিশ আগেই শ্রমিকদের উপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল। আবারও চলল তেমনই প্রস্তুতি। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে পুলিশকে বিশেষ অস্ত্র কিনে দেন ব্যবসায়ীরা। পহেলা মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে নেমে আসেন রাস্তায়। আন্দোলন চরমে ওঠে।

৪ মে, ১৮৮৬ সাল। ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। চারিদিকে হালকা বৃষ্টির সাথে হিমেল হাওয়া বইছে। এরই মধ্যে শিকাগোর হে-মার্কেট স্কয়ার নামক এক বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশ্যে জড়ো হন। তারা ১৮৭২ সালে কানাডায় অনুষ্ঠিত এক বিশাল শ্রমিক শোভাযাত্রার সাফল্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে এটি করেছিলেন।

অগাস্ট স্পীজ নামে এক নেতা জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা বলছিলেন। হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে মেথিয়াস জে. ডিগান নামের একজন পুলিশ তৎক্ষণাৎ এবং আরও ছয়জন পরবর্তীতে নিহত হয়। পুলিশবাহিনী শ্রমিকদের উপর অতর্কিতে হামলা শুরু করে যা রায়ট বা দাঙ্গায় রূপ নেয়। এই রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহীদ হন।

মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসি: পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের হত্যা মামলায় অভিযুক্ত করে অগাস্ট স্পীজ-সহ মোট আটজনকে  প্রহসনমূলকভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে ‘অস্কার নীবে’-কে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। অবাক করা ব্যাপার হলো, ফাঁসি দেয়ার আগেই কারারুদ্ধ অবস্থায় ‘লুইস লিং’ নামের একজন আত্মহত্যা করেন। বাকি ছয়জনকে ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর তারিখে উন্মুক্ত স্থানে ফাঁসি দেয়া হয়।

ফাঁসিতে ঝুলার আগ মুহূর্তে অগাস্ট স্পীজ বলেছিলেন, ‘The day will come when our silence will be more powerful than the voices you are throttling today.’

তখন অ্যাডল্ফ ফিশার বলেছিলেন,  ‘This is the happiest moment of my life.’ এবং আলবার্ট পারসন্স বলেছিলেন, ‘Let the voices of people be heard…’  তিনি এই বাক্যটি শেষ করার আগেই ফাঁসিতে মৃত্যু হয় তার।

মজার ব্যাপার হলো এই মিথ্যা বিচারের অপরাধ শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। ২৬ জুন ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর জন পিটার অল্টগেল্ড -এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিথ্যে ছিল ওই বিচার। পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ’-এর দাবী আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। সেই থেকে পহেলা মে পালিত হয় শ্রমিকদের আত্মদান আর দাবি আদায়ের দিন হিসেবে।

হে-মার্কেট স্মৃতিস্তম্ভ: শিকাগোর ফরেস্ট পার্কে জার্মান ওয়াল্ডহেইম কবরস্থানে (বর্তমানে যা ‘ফরেস্ট হোম কবরস্থান’) ফাঁসি দেয়া পাঁচ শহীদ শ্রমিকদের (ফিল্ডেন ব্যতীত) সমাহিত করা হয়। ১৮৯৩ সালে তাঁদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়। এর একশ’ বছর পর এসে ভাস্কর আলবার্ট ওয়েইনার্ট নির্মিত সেই স্মৃতিস্তম্ভটিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ন্যাশনাল হিস্টোরিক ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ঘোষণা করে।

গ্রানাইটের তৈরি ১৬ ফুট উঁচু এই স্মৃতিস্তম্ভের সামনের দৃশ্যে দেখা যায় একজন পতিত শ্রমিককে ধরে রেখেছে বিচারের প্রতিনিধিত্বকারী এক নারী। এর পাদদেশে লেখা রয়েছে অগাস্ট স্পীজের সেই সর্বশেষ উক্তিটি-‘THE DAY WILL COME WHEN OUR SILENCE WILL BE MORE POWERFUL THAN THE VOICES YOU ARE THROTTLING TODAY’

স্তম্ভটির পিছনের দৃশ্যে রয়েছে গভর্নর অল্টগেল্ডের একটি ব্রোঞ্জের ফলক যা তার ন্যায়বিচারের প্রতীক।

উল্লেখ্য,  শিকাগোর সেই হে-মার্কেট স্কয়ারেও একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে, সেটি নিহত পুলিশ অফিসার মেথিয়াস জে. ডিগানের স্মরণে!

বিশ্বব্যাপী মে দিবস: ১৮৮৯ সালের ১৪ই জুলাই ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সম্মেলনে ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী বছর থেকে ১ মে বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে ‘মে দিবস’ বা ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’।

বাংলাদেশ-সহ বিশ্বের প্রায় আশি-টিরও বেশি দেশে মে দিবস সরকারি ছুটির দিন। এছাড়া বেশ কিছু দেশে বেসরকারিভাবে পালিত হয়।

মজার ব্যাপার হলো যে দেশে এর জন্ম সেই যুক্তরাষ্ট্রই মে দিবস পালন করে না। একই কথা কানাডার ক্ষেত্রেও। এই দুটি দেশ সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার শ্রমিক দিবস পালন করে থাকে।

মায়ের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো সাদিয়া। তার মনে হলো সে যেন এতক্ষণ কোনো ইতিহাস নয় বরং বায়োস্কোপে চোখ রেখে একটা থ্রিলার মুভি দেখছিল! সে মনে মনে ভাবলো, এতো সুন্দর গল্পগুলো না জেনে বা জানার চেষ্টা না করে আমরা শুধু মে দিবসের ছুটি কাটিয়েই আনন্দিত হই। নাহ! পরদিন ক্লাসে গিয়ে তারিনেকে এই রোমাঞ্চকর গল্পটা জানাতেই হবে।

সাদিয়ার মনে শ্রমিক শ্রেণির মানুষদের প্রতি এক অপার ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার সঞ্চার হলো। তার কানে বেজে উঠলো কাজী নজরুল ইসলামের লেখা ‘কুলি-মজুর’ কবিতার পঙক্তি-

‘তারাই মানুষ, তারাই দেবতা,

গাহি তাহাদেরই গান,

তাদেরই ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে

আসে নব উত্থান!’

COMMENTS





নাম

অর্থ ও বাণিজ্য,184,আন্তর্জাতিক,601,কাপাসিয়া,284,কালিয়াকৈর,337,কালীগঞ্জ,216,খেলা,467,গাজীপুর,3312,চাকরির খবর,12,জয়দেবপুর,1519,জাতীয়,2217,টঙ্গী,818,তথ্যপ্রযুক্তি,452,ধর্ম,181,পরিবেশ,119,প্রতিবেদন,277,বিজ্ঞান,52,বিনোদন,555,ভিডিও,49,ভিন্ন খবর,128,ভ্রমন,102,মুক্তমত,24,রাজধানী,681,রাজনীতি,885,লাইফস্টাইল,222,শিক্ষাঙ্গন,339,শীর্ষ খবর,7996,শ্রীপুর,402,সাক্ষাৎকার,12,সারাদেশ,521,স্বাস্থ্য,180,
ltr
item
GazipurOnline.com: যেভাবে এলো মে দিবস
যেভাবে এলো মে দিবস
https://2.bp.blogspot.com/-rZl6ICFKbYQ/XMjhiL_20XI/AAAAAAAAcTM/1AWbarXqEL4_UkdCMX9XgjCsLYnan2L2QCLcBGAs/s1600/may%2Bdibos.png
https://2.bp.blogspot.com/-rZl6ICFKbYQ/XMjhiL_20XI/AAAAAAAAcTM/1AWbarXqEL4_UkdCMX9XgjCsLYnan2L2QCLcBGAs/s72-c/may%2Bdibos.png
GazipurOnline.com
https://www.gazipuronline.com/2019/05/maydibos.html
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/2019/05/maydibos.html
true
13958681640745950
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Read More Reply Cancel reply Delete By প্রচ্ছদ PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share. STEP 2: Click the link you shared to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy