এবার বালিশের কভারের দাম ২৮ হাজার টাকা!

কয়েক দিন আগে একটি প্রকল্পে ক্লিনারের মাসিক বেতন ৪ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন পদে অস্বাভাবিক বেতনের প্রস্তাব করেছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়। এর সমালোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই এবার চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতির দামে অস্বাভাবিক প্রস্তাব দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

এক্ষেত্রে একটি সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্কের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা। যার সম্ভাব্য বাজার মূল্য ১০০ থেকে ২০০ টাকা। এভাবে ১২ ধরনের সরঞ্জামের বাজার দরের সঙ্গে একটি তুলনামূলক ছক তৈরি করে সম্প্রতি প্রস্তাবটি ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

শুধু তাই নয়, সম্ভাব্যতা যাচাই করা বাধ্যতামূলক হলেও এ প্রকল্প তৈরিতে সেটি অনুসরণ করা হয়নি।

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশন লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়কে বলেছে, একটি বিভাগের ১২টি আইটেমের প্রস্তাবিত মূল্যের সঙ্গে আনুমানিক বাজার মূল্যের পার্থক্য ব্যাপক।

এ প্রকল্পের আওতায় কেনার জন্য প্রস্তাবিত সব যন্ত্রপাতি বা চিকিৎসা সরঞ্জাম পর্যালোচনা করলে দামের অসামঞ্জস্য আরও অনেক বেশি হবে। এ ধরনের ব্যয় প্রাক্কলন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এজন্য যারা এ প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরির সঙ্গে যুক্ত তাদের অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

বারবার এ ধরনের অস্বাভাবিক প্রস্তাব দেয়ার পেছনে অবশ্যই কেউ না কেউ জড়িত। অবৈধ সম্পদ অর্জনই তাদের উদ্দেশ্য বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই প্রকল্প প্রস্তাব দেয়া হয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে।

সুতরাং ভুল বলে সংশ্লিষ্টদের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এদের খুঁজে বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। কারণ ‘অঙ্কুরেই দুর্নীতির বীজ’ বপন করছেন তারা। এই দুর্নীতিবাজদের মূল উৎপাটন করা না গেলে প্রশাসনে দুর্নীতি আরও বিস্তৃত হবে।

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের সচিব শেখ ইউসুফ হারুন মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টেলিফোনে বলেন, ইতোমধ্যেই আমরা প্রস্তাবটি ফেরত পেয়েছি।

মন্ত্রণালয়ের যারা এগুলো নিয়ে কাজ করেছেন, তারা সঠিকভাবে তা করেননি। এ ধরনের ব্যয় প্রাক্কলন চুরি করার ক্ষেত্র তৈরি করে। আমি দুঃখিত।

কি করে এ ধরনের প্রকল্প প্রস্তাব আমাদের মাঝ থেকে বেরিয়ে যায়? বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির সময় বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যয় নির্ধারণ সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি হচ্ছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর।

তিনি এত অভিজ্ঞ চিকিৎসক। তারা কিভাবে এ ধরনের প্রাক্কলন করেন? তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।

সার্জিক্যাল ক্যাপ ও মাস্ক ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অন্য যেসব সরঞ্জাম ও যন্ত্রপাতি কেনার প্রস্তাব করেছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- নির্ধারিত সাইজের একটি রেক্সিনের দাম প্রস্তাব করা হয়েছে ৮৪ হাজার টাকা (সম্ভাব্য বাজার মূল্য ৩০০-৫০০ টাকা), স্টেরাইল হ্যান্ড গ্লোভস ৩৫ হাজার টাকা (২০-৫০ টাকা), কটন তাওয়েল ৫ হাজার ৮৮০ টাকা (২৫০-১০০০ টাকা), ৫ এমএল সাইজের টেস্টটিউব-গ্লাস মেডের মূল্য ৫৬ হাজার টাকা (১৫-৫০ টাকা), থ্রিপিন ফ্লাট ও রাউন্ড প্লাগযুক্ত মাল্টিপ্লাগ উইথ এক্সটেনশন কড ৬,৩০০ টাকা (২৫০-৫০০টাকা), রাবার ক্লথ ১০ হাজার টাকা (৫০০-৭০০ টাকা), হোয়াইট গাউন ৪৯ হাজার টাকা (১-২ হাজার টাকা), ডিসপোজাল সু কভার সাড়ে ১৭ হাজার টাকা (২০-৫০ টাকা), বালিশের দাম ২৭ হাজার ৭২০ (৭৫০-২০০০ টাকা) এবং বালিশের কভার ২৮ হাজার টাকা (৫০০-১৫০০ টাকা)।

অর্থনীতিবিদ ও বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এটাকে অনিয়ম, দুর্নীতি না বললে আর কোনটাকে বলা যাবে। অবশ্যই এটা এক ধরনের দুর্নীতি। এসব বিষয় মন্ত্রণালয় থেকে বাইরে আসে কি করে?

সেখানেই তো অনেক ধাপ পেরিয়ে পরিকল্পনা কমিশন পর্যন্ত আসতে হয়। যে যার মতো পণ্যের দান নির্ধারণ করছে। এক ধরনের বিশৃঙ্খলা চলছে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়েও তো প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

অবৈধ সম্পদ আহরণের অসৎ উদ্দেশ্যে যারা এ রকম কর্মকাণ্ড করছেন, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এ ধরনের অসামঞ্জস্য ব্যয় ধরার উদ্দেশ্যই হচ্ছে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কোনো কোনো অংশের সরকারি খাতের অর্থে নিজেদের সম্পদের বিকাশ ঘটানো।

এটি এখন বলা চলে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেছে। তবে শুধু প্রকল্প প্রস্তাব ফেরত দিয়েই থেমে থাকলে হবে না। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিতে হবে।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৮শ’ কোটি টাকা। সম্পূর্ণ সরকারি তহবিলের অর্থে এটি বাস্তবায়ন করার কথা স্বাস্থ্য অধিদফতরের।

প্রক্রিয়াকরণ শেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেলে চলতি বছর থেকে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পটি নিয়ে ২ সেপ্টেম্বর পরিকল্পনা কমিশনে অনুষ্ঠিত হয় প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা। সেখানেই বিভিন্ন সরঞ্জামের দামে অস্বাভাবিক প্রস্তাবের বিষয়টি চিহ্নিত হয়।

প্রকল্পটি প্রক্রিয়াকরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, এ ধরনের অসামঞ্জস্য ব্যয় ধরা পড়ায় প্রকল্পটি অনুমোদন প্রক্রিয়া বন্ধ রেখে বেশকিছু সুপারিশ দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

এজন্য পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান স্যারের সঙ্গে পরামর্শ করেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি জানান, ২৫ কোটি টাকার বেশি প্রকল্প সম্ভাব্যতা যাচাই বাধ্যতামূলক। সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়া এত বড় প্রকল্প নেয়ার কোনো নিয়ম নেই। তাছাড়া যেভাবে দাম প্রাক্কলন করা হয়েছে এটা মেনে নেয়া যায় না।

সূত্র জানায়, এছাড়া প্রকল্পের প্রস্তাবে আরও বিভিন্ন বিষয়ে কেনাকাটায় দামে অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পেয়েছে কমিশন। এগুলো হচ্ছে, আসবাবপত্রের ব্যয় প্রাক্কলনে একেক জায়গায় একেক রকম ধরা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অত্যধিক ধরা হয়েছে। কোথাও ফার্নিচারের পরিমাণ নির্ধারণে রয়েছে অসঙ্গতি।

এছাড়া নির্মাণ ও পূর্ত কাজের ক্ষেত্রে ২০ তলা ভবনের জন্য ভুল করে ১০ তলা ফাউন্ডেশন ধরা হয়েছে। ফাউন্ডেশন নির্মাণের রেট, বিভিন্ন ভবনের ফ্লোরের রেট, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভবনের এক্সট্রা হাইটস, স্যালাইন জোন ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যয় প্রাক্কলন অসামঞ্জস্য হয়েছে।

বইপত্রের দাম প্রাক্কলনের ক্ষেত্রেও নানা অসামঞ্জস্যতা পেয়েছে কমিশন। এক্ষেত্রে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বইপত্র ক্রয়ের জন্য ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে। বইয়ের যে তালিকা দেয়া হয়েছে সেটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্যয় প্রাক্কলন বাজার মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি ধরা হয়েছে।

তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে হাল সংস্করণের বই থাকা সত্ত্বেও পুরনো সংস্করণের বই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তালিকায়।

প্রসঙ্গত, গত সেপ্টেম্বরে সাপোর্ট স্টাফদের অবিশ্বাস্য বেতন প্রস্তাব করেছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়। সেখানে ক্লিনারের বেতন মাসে ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা, অফিস সহায়কের বেতন প্রতি মাসে ৮৩ হাজার ৯৫০ টাকা এবং ক্যাড অপারেটরের বেতন ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা প্রস্তাব দেয়া হয়।

শুধু তাই নয়, বিদেশি পরামর্শকের মাসিক বেতন ধরা হয় ২৫ লাখ টাকা, যা গড়ে ১৬ লাখ টাকা। রেলওয়ের একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পে সাপোর্ট স্টাফদের জন্য এ রকম ব্যয় ধরা হয়। বিষয়টি নজরে আসে পরিকল্পনা কমিশনের। ফলে পিইসি সভা স্থগিত করে সেটিও ফেরত পাঠানো হয়েছিল।

সূত্র: যুগান্তর

COMMENTS





নাম

অর্থ ও বাণিজ্য,193,আন্তর্জাতিক,643,কাপাসিয়া,290,কালিয়াকৈর,351,কালীগঞ্জ,217,খেলা,534,গাজীপুর,3389,চাকরির খবর,20,জয়দেবপুর,1553,জাতীয়,2357,টঙ্গী,829,তথ্যপ্রযুক্তি,472,ধর্ম,187,পরিবেশ,122,প্রতিবেদন,290,বিজ্ঞান,54,বিনোদন,580,ভিডিও,56,ভিন্ন খবর,133,ভ্রমন,108,মুক্তমত,26,রাজধানী,753,রাজনীতি,946,লাইফস্টাইল,240,শিক্ষাঙ্গন,354,শীর্ষ খবর,8638,শ্রীপুর,414,সাক্ষাৎকার,12,সারাদেশ,578,স্বাস্থ্য,189,
ltr
item
GazipurOnline.com: এবার বালিশের কভারের দাম ২৮ হাজার টাকা!
এবার বালিশের কভারের দাম ২৮ হাজার টাকা!
https://1.bp.blogspot.com/-UtI54ki6oJU/XZSRpPcbrqI/AAAAAAAAdzA/56iCa4HWWl46HMlurO5qfjTfGRZbtKcPQCLcBGAsYHQ/s1600/cmc.jpg
https://1.bp.blogspot.com/-UtI54ki6oJU/XZSRpPcbrqI/AAAAAAAAdzA/56iCa4HWWl46HMlurO5qfjTfGRZbtKcPQCLcBGAsYHQ/s72-c/cmc.jpg
GazipurOnline.com
https://www.gazipuronline.com/2019/10/cmc.html
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/2019/10/cmc.html
true
13958681640745950
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Read More Reply Cancel reply Delete By প্রচ্ছদ PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share. STEP 2: Click the link you shared to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy