৭১ বছর বয়সেও যুবলীগ সভাপতি, প্রথম জীবনে করতেন এরশাদের যুব সংহতি

বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন তাঁর। তামাকের বিকল্প ‘টেন্ডু পাতা’ থেকে শুরু করে তৈরি পোশাকের ব্যবসা করেছেন। কিন্তু ব্যবসা তাঁকে ঋণখেলাপি করেছে। রাজনীতিও তাঁকে হতাশ করেছে লম্বা সময়। বিড়ি শ্রমিক লীগ, জাতীয় পার্টির যুব সংগঠন, আওয়ামী লীগ করেও লম্বা সময় ছিলেন পেছনের কাতারে। তবে যুবলীগ তাঁকে নিয়ে গেছে শীর্ষে। যুবলীগের চেয়ারম্যান হওয়ার পর শোধ করেছেন পুরোনো ব্যর্থতার দেনা।

ভাগ্যগুণে ওম’র ফারুক চৌধুরী এমন সাফল্য পেয়েছেন বলে মনে করছেন যুবলীগের অনেক নেতা। তাঁরা জানান, ২০০৩ সালে যুবলীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য হন ওম’র ফারুক। এর আগের কমিটিতে কার্যনির্বাহী সদস্য ছিলেন তিনি। ২০০৯ সালে ভা’রপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আর ২০১২ সালে হন চেয়ারম্যান। এরপর থেকে যুবলীগে তাঁর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের শীর্ষ পদ পাওয়ার পর সম্পদ নিলামে ওঠার পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন এবং ধনাঢ্য জীবন যাপন করছেন। যদিও তাঁর দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই।

এ নিয়ে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সমালোচনাও আছে। যুবলীগের একাধিক নেতা জানান, চেয়ারম্যানের সঙ্গে তাঁদের সরাসরি আলাপ করার সুযোগও কম। যুবলীগের দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসুর রহমানের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়। পিয়ন থেকে দপ্তর সম্পাদক হওয়া কাজী আনিসও ‘কমিটি–বাণিজ্য’ করে অনেক বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন। আনিস এখন পলাতক।

যুবলীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এমনই ভাগ্য ওম’র ফারুকের, ৬৪ বছর বয়সে হয়েছেন যুবলীগের চেয়ারম্যান। অথচ যুবলীগের ইতিহাসে এর আগে ৫০ বছরের বেশি বয়সী কেউ চেয়ারম্যান হননি। ১৯৭২ সালের ​নভেম্বরে শেখ ফজুলল হক মণি যখন যুবলীগ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ৩২ বছর।

২০১৭ সালের জাতীয় যুবনীতি অনুসারে, ‘১৮ থেকে ৩৫ বছরের বয়সের যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক যুব হিসেবে গণ্য হবে।’ কিন্তু যুবলীগ চেয়ারম্যানের বর্তমান বয়স ৭১ বছর। তিনি সাত বছর ধরে চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন। যদিও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কমিটি করার কথা। শুধু তিনি নন, যুবলীগের নেতাদের আরও অনেকের বয়স ৬০ পেরিয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

ওম’র ফারুককে তরুণ বয়স থেকে চেনেন; ঢাকা ও চট্টগ্রামে এমন রাজনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৪৮ সালে জন্ম নেওয়া ওম’র ফারুক চৌধুরী সত্তরের দশকে চট্টগ্রাম জে’লা বিড়ি শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের প্রয়াত কেন্দ্রীয় নেতা এস এম ইউসুফ ছিলেন তাঁর রাজনৈতিক মুরব্বি। বিড়ি শ্রমিক লীগের নেতা হয়ে মিয়ানমা’র থেকে টেন্ডু পাতা আম’দানি শুরু করেন ওম’র ফারুক। তামাকের বিকল্প এ টেন্ডু পাতা বিড়ির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

এইচ এম এরশাদ ক্ষমতায় আসার সময় ওম’র ফারুক শ্রমিক লীগের রাজনীতির সঙ্গে জ’ড়িত ছিলেন। জাতীয় পার্টির প্রয়াত নেতা নাজিউর রহমান (মঞ্জু) এরশাদের মন্ত্রিসভা’র সদস্য হলে ওম’র ফারুক দল বদল করেন। জাতীয় পার্টির অঙ্গসংগঠন যুব সংহতির চট্টগ্রাম উত্তর জে’লার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ওম’র ফারুক চৌধুরী নাজিউর রহমানের ভায়রা ভাই এবং শেখ ফজলুল করিম সেলিমের ভগ্নিপতি।

চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য জামশেদুল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, তৎকালীন মন্ত্রী নাজিউর রহমানের উৎসাহে ওম’র ফারুক জাতীয় পার্টির যুব সংগঠন যুব সংহতির চট্টগ্রাম উত্তর জে’লার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।

এরশাদ সরকারের পতনের পর কিছুদিন নীরব ছিলেন ওম’র ফারুক। ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম উত্তর জে’লা আওয়ামী লীগের সম্মেলন হলে তিনি সদস্য হন। ১৯৯৭ সালে তিনি উত্তর জে’লা কমিটির কোষাধ্যক্ষ হন। ওই কমিটির মেয়াদ ছিল ২০০৪ সাল পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম উত্তর জে’লা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম প্রথম আলোকে বলেন, ১৯৯২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে উত্তর কমিটিতে সদস্য ও কোষাধ্যক্ষ ছিলেন ওম’র ফারুক চৌধুরী।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, এরশাদের আমলে যুব সংহতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর ওম’র ফারুকের আয় বাড়তে থাকে। মালিক হন পোশাক কারখানার। ওম’র ফারুক চৌধুরী নিজেও গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ১৯৮৮ সালে রাউজানে পোশাক কারখানা স্থাপন করেছিলেন, যা পরে চট্টগ্রাম শহরের জুবিলি রোডে স্থা’নান্তর করেন।

তবে এই ব্যবসা করতে গিয়ে সম্পদ নিলামে ওঠার পরিস্থিতি তৈরি হয় ওম’র ফারুকের। ব্যাংকঋণের দায়ে নগরের একটি বাড়ি এবং রাউজানের সুলতানপুর গ্রামের জমি ও ঘর নিলামে ওঠার চূড়ান্ত প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে। নিলামে তোলার দিনক্ষণও ধার্য করেছিলেন চট্টগ্রামের অর্থঋণ আ’দালত। উচ্চ আ’দালত থেকে স্থগিতাদেশ এনে নিলাম ঠেকান তিনি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে সোনালী ব্যাংকের চট্টগ্রামের কে সি দে রোডের শাখা থেকে ওম’র ফারুক চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী’ শেখ সুলতানার নামে থাকা প্রতিষ্ঠান মেসার্স রাওনিট অ্যাপারেলস ও মেসার্স রাও গার্মেন্টসের নামে ১১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ঋণ নেওয়া হয়, যা পরে সুদ-আসলে সাড়ে ৪৪ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। টাকা আদায় না করতে পেরে অর্থঋণ আ’দালতে যায় ব্যাংক।

গত সোমবার সোনালী ব্যাংকের চট্টগ্রামের কে সি দে রোড শাখায় গেলে উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্ম’দ নুরুন নবী এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে রাজি হননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ওই দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক মোটামুটি অঙ্কের টাকা পরিশোধ করেছেন, কিন্তু মা’মলা নিষ্পত্তি হয়নি। সুদ মওকুফের জন্য ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সুযোগ দিয়েছে সোনালী ব্যাংক। ওম’র ফারুক চৌধুরী চাইলে এ সুযোগ নিতে পারেন।

চট্টগ্রামের অর্থঋণ আ’দালতে সোনালী ব্যাংকের করা মা’মলা দুটি ১০ বছর ধরে ঝুলে আছে। সোনালী ব্যাংকের আইনজীবী মোহাম্ম’দ আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চ আ’দালতে দুই মা’মলারই কার্যক্রম এখনো স্থগিত রয়েছে। এ কারণে ওম’র ফারুকের শহরের বাড়ি এবং গ্রামের জমি ও ঘর নিলামে তোলা যায়নি।

এ বিষয়ে ওম’র ফারুক চৌধুরী গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, নানা প্রতিকূলতায় তিনি শিল্পপ্রতিষ্ঠান দুটি দাঁড় করাতে পারেননি। এ জন্য তাঁর ব্যাংক দেনা বাড়ে। তিনি আরও বলেন, সোনালী ব্যাংক এখনো টাকা পাবে। সুদ মওকুফের জন্য আবেদন করা আছে।

সম্পদ নিলামে ওঠার দুই মাস আগেই যুবলীগের ভা’রপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন ওম’র ফারুক চৌধুরী। আওয়ামী লীগও ওই বছরের শুরুতে ক্ষমতায় আসে। পরিস্থিতি বদলাতে থাকে তাঁর। ব্যাংকঋণের একটি অংশ পরিশোধ করেছেন তিনি। কিন্তু এখন আর ওম’র ফারুক চৌধুরীর দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা নেই। তিনি গত সোমবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি আগে পেঁয়াজ, আদা ও গুঁড়া দুধের আম’দানিকারক ছিলাম। এখন বন্ধুদের সঙ্গে আমা’র ব্যবসা আছে।’ অবশ্য কোন বন্ধুদের সঙ্গে কী’ ব্যবসা করেন, সেটা পরিষ্কার করে বলেননি তিনি।

একাধিকবার দল পরিবর্তন এবং ৭১ বছর বয়সেও যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে থাকার বিষয়ে তাঁর বক্তব্য জানা যায়নি। এ বিষয়ে গত মঙ্গলবার দিনভর অনেকবার মুঠোফোনে চেষ্টা করেও ওম’র ফারুক চৌধুরীকে পাওয়া যায়নি। তাঁর নিয়মিত কার্যালয় হিসেবে পরিচিত ধানমন্ডির যুব গবেষণা কেন্দ্রে গিয়েও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

এত বয়সেও যুব সংগঠনের নেতৃত্বে থাকাকে ‘রাজনীতিবিদদের কা’ণ্ডজ্ঞানের সমস্যা’ বলে মনে করেন লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ব্যক্তিকেন্দ্রিক সুবিধাবাদের রাজনীতিতে নিয়মনীতি, সামাজিকতা কিছুই মানা হচ্ছে না। এমনকি বয়সটাও মানা হচ্ছে না। চক্ষুলজ্জাও হারিয়ে ফেলেছে। ৪০ বছরের বেশি কারও কোনোভাবেই যুবলীগের নেতা হওয়া উচিত নয়।

- প্রথম আলো

COMMENTS





নাম

অর্থ ও বাণিজ্য,193,আন্তর্জাতিক,643,কাপাসিয়া,290,কালিয়াকৈর,351,কালীগঞ্জ,217,খেলা,534,গাজীপুর,3389,চাকরির খবর,20,জয়দেবপুর,1553,জাতীয়,2357,টঙ্গী,829,তথ্যপ্রযুক্তি,472,ধর্ম,187,পরিবেশ,122,প্রতিবেদন,290,বিজ্ঞান,54,বিনোদন,580,ভিডিও,56,ভিন্ন খবর,133,ভ্রমন,108,মুক্তমত,26,রাজধানী,753,রাজনীতি,946,লাইফস্টাইল,240,শিক্ষাঙ্গন,354,শীর্ষ খবর,8638,শ্রীপুর,414,সাক্ষাৎকার,12,সারাদেশ,578,স্বাস্থ্য,189,
ltr
item
GazipurOnline.com: ৭১ বছর বয়সেও যুবলীগ সভাপতি, প্রথম জীবনে করতেন এরশাদের যুব সংহতি
৭১ বছর বয়সেও যুবলীগ সভাপতি, প্রথম জীবনে করতেন এরশাদের যুব সংহতি
https://1.bp.blogspot.com/-KkM5qmFM_zA/XZYVM79cvfI/AAAAAAAAd0o/gKx2Usdgxg8Xxas42iYSkV8HHnBGcTIaQCLcBGAsYHQ/s1600/jubok.jpg
https://1.bp.blogspot.com/-KkM5qmFM_zA/XZYVM79cvfI/AAAAAAAAd0o/gKx2Usdgxg8Xxas42iYSkV8HHnBGcTIaQCLcBGAsYHQ/s72-c/jubok.jpg
GazipurOnline.com
https://www.gazipuronline.com/2019/10/of.html
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/
https://www.gazipuronline.com/2019/10/of.html
true
13958681640745950
UTF-8
Loaded All Posts Not found any posts VIEW ALL Read More Reply Cancel reply Delete By প্রচ্ছদ PAGES POSTS View All RECOMMENDED FOR YOU LABEL ARCHIVE SEARCH ALL POSTS Not found any post match with your request Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS PREMIUM CONTENT IS LOCKED STEP 1: Share. STEP 2: Click the link you shared to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy